বাংলাদেশের সবার মধ্যে একটা প্রবণতা আছে, আর যাই হোক পায়ের জুতাটা হতে হবে ফ্যাশনেবল এবং ব্র্যান্ডি। ইদের বাজারেও নতুন জামা- কাপড় কেনার পর বাচ্চারা বায়না ধরে নতুন জুতার জন্য। আমাদের দেশেই এখন তৈরি হচ্ছে বিশ্বমানের জুতা। এবার বস্ত্রশিল্পের মত সম্ভবনাময়ী শিল্প হতে পারে চামড়া শিল্পও।

চীনের বাণিজ্য নীতির পরিবর্তনের ফলে এখন বাংলাদেশের চামড়া শিল্পের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে বিনিয়োগকারীরা।

Mayol zapatos clásicos

উদ্যোক্তাদের জন্য সুখবর হল, সুযোগ ও সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের ৫০ কোটি ডলারের জুতা শিল্পকে পাঁচ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।

চীনের চামড়া শিল্প নিয়ে রিসার্চ অ্যান্ড মার্কেট ডটকমের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১২-১৩ সালে চীনে চামড়ার তৈরি জুতা শিল্পের উৎপাদন ৫ দশমিক ২৯ শতাংশ থেকে ৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ কমেছে।চীনের ছেড়ে দেওয়া বিশ্বের জুতার বাজারের ওই অংশটিই ধরতে চাইছেন বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে চামড়া, চামড়াজাত পণ্য ও চামড়ার জুতা রপ্তানি করে বাংলাদেশের আয় করেছে ১২৯ কোটি ডলার, যা মোট রপ্তানি আয়ের ৪ দশমিক ২ শতাংশ।

চামড়া শিল্পের রপ্তানি আয়ের মধ্যে গত অর্থবছর জুতা রপ্তানি থেকে এসেছে ৫৫ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরে জুতা রপ্তানি করে ৪১ দশমিক ৯৩ কোটি ডলার আয় করেছিল বাংলাদেশ।চলতি ২০১৪-১৫ অর্থবছরেও এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে আয় বেড়েছে ৭ শতাংশ; ফুটওয়্যার রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২২ দশমিক ১৬ শতাংশ।

 

পরিসংখ্যান বলছে, নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য এই শিল্প নিয়ে কোন পদক্ষেপ নেয়া খুব একটা ঝুঁকিপূর্ণ হবে না।

এরই মধ্যে অন্তত ৫১টি প্রতিষ্ঠান যৌথ বিনিয়োগে বাংলাদেশের জুতা শিল্পে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

বাংলাদেশের জুতা শিল্পের শুরু হিসেবে খুব একটা খারাপ অবস্থায় নেই।এমনকি অনেক চামড়া ব্যবসায়ী মনে করেন বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের চেয়ে চামড়া শিল্পে লাভ করার সম্ভাবনা বেশী।কারণ চামড়ার জুতা তৈরির সকল ধরনের সুবিধাই রয়েছে এদেশে।লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১১০টি রপ্তানি মুখী কারখানায় চামড়ার জুতা তৈরি হয়।

এর মধ্যে এপেক্স, এফবি, পিকার্ড বাংলাদেশ, জেনিস, আকিজ, আরএমএম বেঙ্গল এবং বে’র রয়েছে নিজস্ব ট্যানারি ও চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা।এর বাইরে শুধু চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে এমন কারখানার সংখ্যা ২০৭টি।

1337182637-gallerie-apex-launches-fashion-street-at-banani-11_1218335

চীনের বাজারে শ্রমিকদের বেতন আগের তুলনায় বেড়ে গেছে। আগের মতো সস্তা শ্রম না মেলায় অন্য ব্যবসায় মনোযোগী হচ্ছে চীন।যেটা বাংলাদেশের জন্য একপ্রকারের আশীর্বাদ।

বাংলাদেশে জুতার চাহিদা কত- তার সঠিক কোন পরিসংখ্যান সরকারের হাতে নেই। তবে বাজারের অভিজ্ঞতা থেকে এ খাতের ব্যবসায়ীদের ধারণা, দেশে প্রতিবছর আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ কোটি (২০০ থেকে ২৫০ মিলিয়ন) জুতার চাহিদা রয়েছে, যার ৯২ থেকে ৯৫ শতাংশ দেশীয় উৎপাদন থেকে পূরণ হয়।

বিশ্বে বাংলাদেশি পণ্যের সবচেয়ে বড় ক্রেতা জাপান; মোট রপ্তানি পণ্যের ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ জাপানের বাজারেই যায়। আর বাংলাদেশের চামড়ার জুতার ক্ষেত্রে শুরু থেকেই জাপান ‘ডিউটি ফ্রি’ ও ‘কোটা ফ্রি’ সুবিধা দিয়ে আসছে।

 

বাংলাদেশের জুতা তৈরি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে আছে এপেক্স।গাজীপুরে এপেক্সের নিজস্ব কারখানায় প্রতিদিন ২০ হাজার জোড়া জুতা তৈরি হয়।

দেশীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি টিম্বারল্যান্ড, এলডো ও এবিসি মার্টের মতো বিশ্বখ্যাত কোম্পানির জন্য জুতা তৈরি করে অ্যাপেক্স।

ওরিয়ন ফুটওয়্যারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল আমীন মোল্লা বলেন,“বিভিন্ন সুবিধার কারণে আমাদের এ বাজার বিদেশিদের কাছে খুবই আকর্ষণীয় খাত। আর এতো সস্তায় বিদ্যুৎ পৃথিবীর কোথাও পাওয়া যায় না, সেটাও একটা বড় দিক। সব মিলিয়ে বিদেশি উদ্যোক্তাদের জন্য বিনিয়োগ উপযোগী স্থিতিশীল পরিস্থিতি দিতে পারলে এবং নিজেরা আরও বেশি করে রপ্তানিতে যেতে পারলে পাঁচ বছরেই এ বাজার বেড়ে ১৫ বিলিয়ন ডলারের হতে পারে।”

 

তবে বাংলাদেশকে এক্ষেত্রে ভারত, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, হাইতি ও বাহামা দ্বীপপুঞ্জের সঙ্গে প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হবে।রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে এদের সাথে আমাদের বড় পার্থক্য তৈরি হতে পারে।

১৯৯০ সাল পর্যন্ত কাঁচা চামড়া বা ওয়েট-ব্লু লেদার এবং প্রক্রিয়াজাত করা চামড়া ক্রাস্ট লেদার রপ্তানি করে আসছে। তবে এখন বেশি রপ্তানি হয় ফিনিশড লেদার।বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে ২০০ থেকে ৩০০ মিলিয়ন বর্গফুট ফিনিশড লেদার উৎপাদন হয়, যার বেশির ভাগটাই রপ্তানি হয়।২০১৪ সালে যেখানে ২৮০ মিলিয়ন বর্গফুট ফিনিশড লেদার উৎপাদিত হয়েছে, সেখানে রপ্তানি হয়েছে ২৬০ মিলিয়ন বর্গফুট।

Lather

বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনার মাঝে রয়েছে, হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি কারখানাগুলো সাভারের চামড়া শিল্প নগরীতে স্থানান্তর করা।এই পদক্ষেপের বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের চামড়া শিল্প আগের চেয়ে বেশী সম্প্রসারিত হবে।

চামড়ার জুতা উৎপাদনকারী প্রধান দেশ চীন, ভিয়তেনাম এবং ব্রাজিল এ খাত থেকে ধীরে ধীরে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে।তাই বলা যায়, বিদেশি বিনিয়োগ আসার সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাত হতে যাচ্ছে চামড়া শিল্প।

এ শিল্পের জন্য পর্যাপ্ত কাঁচামাল, চামড়া প্রক্রিয়াজাত করার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, সস্তা শ্রম এবং জুতা তৈরির জন্য যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধাসহ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা নিরসনে বেশকিছু সরকারি উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। এসব প্রয়োজনীয়তা পূরণ হলেই বাংলাদেশ চামড়া শিল্পে বিশ্বের প্রথম সারিতে থাকবে বলেই আশা করা যায়।তাই নতুন উদ্যোক্তারা এই শিল্পে বিনিয়োগ করার জন্য এখন থেকেই চিন্তা ভাবনা শুরু করতে পারেন।

Tousif Alam